রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানির সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর এই সিদ্ধান্ত আগের অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কয়েক সপ্তাহ আগেও রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার লক্ষ্যে আইন প্রণয়ন করেছিলেন তিনি। অথচ এখন নিজেই রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছেন।
সম্প্রতি ট্রাম্প জানান, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আগামী কয়েক মাস যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ববাজারে ডিজেল রপ্তানি করতে সম্মত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে জ্বালানির উচ্চমূল্য ও মূল্যস্ফীতি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলছে। এর প্রভাব পড়ছে ট্রাম্পের জনসমর্থনেও। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে তাঁর প্রশাসন।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের আগে রাশিয়া থেকে তেল কেনার সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের ওপর অভ্যন্তরীণ চাপের বিষয়টি সামনে এনেছে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে চাপে ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বিশেষভাবে পড়েছে কৃষিনির্ভর রাজ্যগুলোতে। কানসাস, টেক্সাস ও ওহাইওর মতো রাজ্যে ভোটারদের সমর্থন হারানোর আশঙ্কা করছেন ট্রাম্প। এসব রাজ্যের ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়লে নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টিকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ফেডারেল কর স্থগিত করার উদ্যোগ নিয়েছেন ট্রাম্প। পাশাপাশি কৃষিকাজে ব্যবহৃত জ্বালানির দাম কমানোর ব্যবস্থাও করেছেন তিনি। এমনকি নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত ইরানে নতুন করে হামলা না চালানোর ঘোষণাও দিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও চলমান সংঘাতের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্বেগ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ এই চাপের কারণেই রাশিয়া থেকে তেল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ট্রাম্প।
তবে রাশিয়া কীভাবে জ্বালানি সরবরাহ করবে এবং এর বিনিময়ে মস্কো কী ধরনের সুবিধা পাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এদিকে সিদ্ধান্তটি নিয়ে ট্রাম্পের মিত্র ও রাজনৈতিক বিরোধীদের মধ্যে সমালোচনা শুরু হয়েছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এ উদ্যোগকে পুতিনের জন্য উপহার হিসেবে দেখছেন। তাঁর মন্তব্য, রাশিয়া এর প্রতিদান দেবে সন্ত্রাস ও বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে।
তাৎক্ষণিক বড় স্বস্তির আশা কম
রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানির সিদ্ধান্ত নির্বাচনে ট্রাম্পকে কতটা সুবিধা দেবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। পাশাপাশি রাশিয়ার তেল কবে নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পৌঁছাবে, সেটিও নিশ্চিত নয়।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন প্রায় ৩৬ লাখ ব্যারেল ডিজেল ব্যবহৃত হয়। সে হিসাবে রাশিয়া এ মাসে তিন লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করলেও তা যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র ১২ ঘণ্টার চাহিদার সমান হবে। ফলে রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি আমদানির সিদ্ধান্তে তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের স্বস্তি আসবে বলে মনে করছেন না বিশ্লেষকেরা।
যুদ্ধ বন্ধে ইরানের শর্ত ট্রাম্পকে জানালেন পুতিন
ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত বন্ধের বিষয়ে তেহরানের শর্ত ও অবস্থান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে তুলে ধরেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ জানিয়েছেন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে আলোচনার পর সংঘাত বন্ধের বিষয়ে তেহরানের অবস্থান ট্রাম্পকে জানিয়েছেন পুতিন।
এর আগে ইরানের প্রেসিডেন্টকে আশ্বস্ত করে পুতিন বলেছিলেন, যুদ্ধ বন্ধে মস্কো সব ধরনের চেষ্টা চালাবে। সেই আলোচনার পরদিনই ট্রাম্পের সঙ্গে পুতিনের ফোনালাপের বিষয়টি সামনে আনে ক্রেমলিন।
সংকট নিরসনে রাশিয়ার মধ্যস্থতার উদ্যোগকে ট্রাম্পও স্বাগত জানিয়েছেন।
‘ইরানের শাসনব্যবস্থা নয়, তাদের সভ্যতার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষোভ’
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা আলি আকবর বেলায়েতি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সাম্প্রতিক বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন। অ্যাথেন্সে দেওয়া বক্তব্যে রুবিও প্রাচীন গ্রিক ও পারস্যের সংঘাতের সঙ্গে তেহরান ও ওয়াশিংটনের বর্তমান উত্তেজনার তুলনা করেছিলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বেলায়েতি দাবি করেন, ইরানের শাসনব্যবস্থার চেয়ে দেশটির সভ্যতার প্রতিই যুক্তরাষ্ট্রের মূল ক্ষোভ বেশি। তাঁর বক্তব্য, হিরোশিমা, ভিয়েতনাম, ইরাক ও আফগানিস্তানে রক্তপাত ঘটানো দেশটির অন্যদের নৈতিকতা শেখানোর অধিকার নেই।
‘আলি খামেনিকে হত্যা করা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল’
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিকে হত্যার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল বলে মন্তব্য করেছেন ইসরায়েলের ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়াইর গোলান। তাঁর দাবি, খামেনি হত্যার লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন—এমন যুক্তি থাকলেও তাঁকে হত্যা করা ইসরায়েলের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল না।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় আলি খামেনি নিহত হন। এর আগে তিনি ফতোয়ার মাধ্যমে ইরানে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি নিষিদ্ধ করেছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আলি খামেনির মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনি উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব নেন। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে মোজতবা তাঁর বাবার তুলনায় আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
