আধুনিক গবেষণাগা, জার্নাল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ শুরুর অনেক আগেই মুসলিম বিশ্বে গড়ে উঠেছিল বিস্ময়কর জ্ঞানচর্চার সভ্যতা। বাগদাদ থেকে কর্ডোবা, সমরকন্দ থেকে কায়রো জ্ঞান অর্জন তখন শুধু পেশা ছিল না, বরং নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্বের অংশ ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় জন্ম নিয়েছিলেন এমন কিছু মুসলিম বিজ্ঞানী, যাদের চিন্তা ও আবিষ্কার আজও প্রভাব ফেলছে আধুনিক বিজ্ঞান, চিকিৎসা, প্রযুক্তি ও দর্শনে।
ইসলামের স্বর্ণযুগে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অসামান্য অবদান রাখা ১০ প্রভাবশালী মুসলিম বিজ্ঞানী ও মনীষী হলেন।
১. মুহাম্মাদ ইবনে মুসা আল-খারেজমি (আলগোরিদম ও বীজগণিতের জনক): গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে অসামান্য অবদান।
বাগদাদের বিখ্যাত বায়তুল হিকমায় কাজ করতেন মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খাওয়ারিজমি। তিনি গণিতকে নতুন ভাষা দেন। তার লেখা সমীকরণ বিষয়ক গ্রন্থ থেকেই জন্ম নেয় আল-জাবর বা বীজগণিত।
তার নাম থেকেই পরবর্তীতে তৈরি হয় অ্যালগরিদম শব্দটি, যা আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সফটওয়্যার, সার্চ ইঞ্জিন ও স্মার্টফোন প্রযুক্তির ভিত্তি। তিনি শুধু অঙ্ক কষেননি, মানুষকে যুক্তিবাদীভাবে চিন্তা করতে শিখিয়েছেন।
২. ইবনে সিনা (আভিসেনা): চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং দর্শনে অসামান্য অবদান, তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ক্যানন অফ মেডিসিন’।
কিশোর বয়সেই চিকিৎসক হিসেবে খ্যাতি পেয়েছিলেন ইবনে সিনা। তার লিখিত কানুন ফিত-তিব বা চিকিৎসাবিদ্যার বিশ্বকোষ প্রায় ৬০০ বছর ইউরোপ ও মুসলিম বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য ছিল।
চিকিৎসার পাশাপাশি তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, দর্শন ও রসায়ন নিয়ে লিখেছেন। আধুনিক রোগ নির্ণয় পদ্ধতি ও রোগীকেন্দ্রিক চিকিৎসার ভিত্তি তার চিন্তাতেই নিহিত।
৩. হাসান ইবনুল হায়সাম (আধুনিক আলোকবিদ্যার জনক): আলোকবিদ্যা ও পদার্থবিদ্যায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছেন।
ইবনে আল-হাইসাম পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করেন আলো সোজা পথে চলে এবং চোখ আলো গ্রহণ করেই দেখে। তার গবেষণা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান ও অপটিক্সের ভিত্তি। আজকের প্রতিটি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা তার চিন্তার উত্তরসূরি।
৪. জাবির ইবনে হায়য়ান (রসায়নের জনক): রসায়নের আদি প্রবর্তক, যিনি পরীক্ষণমূলক রসায়ন শুরু করেন।
জাবির ইবনে হাইয়ান পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণার সূচনা করেন এবং পদার্থ বিশ্লেষণের পদ্ধতি তৈরি করেন। আধুনিক কেমিস্ট্রির ভিত্তি তার হাতেই গড়া।
৫. আল-রাজী (রাজেস): চিকিৎসাবিজ্ঞানে অবদান ও বসন্ত রোগের কারণ আবিষ্কার।
আল-রাজি প্রথম চিকিৎসক যিনি গুটি বসন্ত ও হামকে আলাদা রোগ হিসেবে শনাক্ত করেন। হাসপাতালের চিকিৎসক হিসেবে তিনি রোগের লক্ষণ, চিকিৎসা ও ফলাফল লিখে রাখতেন।
রসায়নে তিনি পাতন, ছাঁকন ও স্ফটিকীকরণ পদ্ধতির উন্নয়ন করেন। তিনি চিকিৎসাকে কুসংস্কার থেকে বিজ্ঞানের পথে নিয়ে আসেন।
৬. আবুল কাসিম আল-জাহরাবি (আধুনিক অস্ত্রোপচারের জনক): সার্জারির যন্ত্রপাতি ও কৌশল আবিষ্কারক।
আবুল কাসিম আল-জাহরাবি (৯৩৬–১০১৩) আন্দালুসীয় (স্পেন) মুসলিম চিকিৎসক, যাকে আধুনিক শল্যচিকিৎসা বা সার্জারির জনক বলা হয় [১, ৭]। তিনি ৩০ খণ্ডের চিকিৎসাবিজ্ঞান বিশ্বকোষ ‘কিতাব আল-তাসরিফ’ রচনার জন্য বিখ্যাত, যা ৫০০ বছর ইউরোপে চিকিৎসাবিদ্যার পাঠ্যবই ছিল [২, ৬]। তিনি ২০০টির বেশি সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি ও পদ্ধতি (যেমন: সেলাইয়ের জন্য ক্যাটগাট) উদ্ভাবন করেছিলেন
৭. ইবনুন নাফিস: রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়ার প্রথম বর্ণনাকারী।
ইবনুন নাফিস (১২১৩–১২৮৮) ছিলেন ত্রয়োদশ শতাব্দীর একজন প্রখ্যাত আরব মুসলিম চিকিৎসক, যিনি সর্বপ্রথম মানুষের ফুসফুসীয় রক্ত সঞ্চালন বা পালমোনারি সারকুলেশন (Pulmonary Circulation) সঠিকভাবে বর্ণনা করেন [১, ২, ৫]। তিনি হৃদপিণ্ডের মধ্যবর্তী প্রাচীর (septum) ছিদ্রযুক্ত—এই প্রাচীন ধারণা ভুল প্রমাণ করে দেখান যে, ডান ভেন্ট্রিকল থেকে রক্ত ফুসফুসে ফুসফুসীয় ধমনীর মাধ্যমে গিয়ে, সেখানে বাতাস বা অক্সিজেনের সাথে মিশে ফুসফুসীয় শিরার মাধ্যমে বাম ভেন্ট্রিকলে ফেরে।
৮. আল-বিরুনি (ভূগোল ও জ্যোতির্বিজ্ঞান): পৃথিবী গোল এবং এর পরিধি পরিমাপের গাণিতিক ব্যাখ্যা দেন।
আধুনিক যন্ত্র ছাড়াই তিনি পৃথিবীর ব্যাসার্ধ প্রায় নির্ভুলভাবে নির্ণয় করেন। পাশাপাশি ধর্ম, সংস্কৃতি, ভাষা ও ভূগোল নিয়ে গবেষণা করে তিনি বহুসংস্কৃতির প্রতি সম্মান দেখান। তিনি দেখিয়েছেন বিজ্ঞান ও মানবসভ্যতা একে অপরের পরিপূরক।
৯. আব্বাস ইবনে ফিরনাস (বিমান চালনার জনক): প্রথম উড্ডয়ন প্রচেষ্টার অন্যতম পথিকৃৎ।
আব্বাস ইবনে ফিরনাস (৮১০-৮৮৭ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন আন্দালুসীয় মুসলিম বিজ্ঞানী, উদ্ভাবক এবং প্রথম মানব পাইলট, যিনি ৯ম শতাব্দীতে রেশম, কাঠ ও পাখির পালক ব্যবহার করে তৈরি গ্লাইডারের সাহায্যে আকাশে উড্ডয়ন করেছিলেন [১, ২, ৮]। তিনি মধ্যযুগীয় বিমান চালনার জনক [১২] হিসেবে পরিচিত এবং তার গবেষণাই পরবর্তীতে এভিয়েশন প্রযুক্তির ভিত্তি স্থাপন করে, যা লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির মতো উদ্ভাবকদের অনুপ্রাণিত করেছিল
১০. আল-জাজারি (রোবোটিক্সের জনক): যান্ত্রিক প্রকৌশল ও স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের উদ্ভাবক।
ইসমাইল আল-জাজারি (১১৩৬–১২০৬) দ্বাদশ শতাব্দীর একজন প্রখ্যাত মুসলিম প্রকৌশলী, উদ্ভাবক এবং গণিতবিদ, যাকে আধুনিক রোবোটিক্সের জনক (Father of Robotics) বলা হয় [৩, ৫]। তিনি পানি-চালিত এবং যান্ত্রিক প্রোগ্রামেবল ‘অটোমেটা’ (স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র) উদ্ভাবন করেন, যার মধ্যে পানির ক্লক এবং হাতের কাজের রোবট অন্যতম [১, ৩, ৬]। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কিতাব ফি মাআরিফাত আল-হিয়াল আল-হান্দাসিয়া’ (১২০৬) যান্ত্রিক প্রকৌশলের ভিত্তি স্থাপন করেছিল
এই বিজ্ঞানীগণ আধুনিক বিজ্ঞান, চিকিৎসা ও প্রযুক্তির ভিত্তি স্থাপন করে মানব সভ্যতায় চিরস্থায়ী প্রভাব রেখেছেন।
সূত্র : হালাল টাইমস
