লাগাতার ধর্মঘটের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে, যার ফলে আমদানি পণ্য খালাস ব্যাহত হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে দেশের প্রধান এই সমুদ্রবন্দরের কার্যক্রম প্রায় থমকে গেছে। এর ফলে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। সামনে পবিত্র রমজান মাস থাকায় ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আইসিডিতে কনটেইনারের পাহাড়
বন্দরে অচলাবস্থার প্রভাব পড়েছে বেসরকারি ১৯টি কনটেইনার ডিপোর (আইসিডি) ওপর। বন্দর থেকে পণ্য খালাস করতে না পারায় ডিপোগুলোতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের জট সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) তথ্যমতে, সাধারণত ডিপোগুলোতে ৮ হাজার টিইইউএস রপ্তানি কনটেইনার থাকলেও বর্তমানে তা ১১ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
বিকডার মহাসচিব মো. রুহুল আমিন শিকদার জানান, গত মঙ্গলবার থেকে আমদানি-রপ্তানি ও খালি কনটেইনার পরিবহন সম্পূর্ণ বন্ধ। পতেঙ্গা টার্মিনালে নামমাত্র কাজ হলেও তা চাহিদার তুলনায় নগণ্য। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে আসন্ন রমজানে পণ্য হ্যান্ডলিং করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
বহির্নোঙরে জাহাজ জট, গুনতে হচ্ছে জরিমানা
বর্তমানে বন্দরের বহির্নোঙরে ৯৮টি মাদার ভেসেল বা বড় জাহাজ পণ্য খালাসের অপেক্ষায় অলস বসে আছে। এর মধ্যে ৩২টি জাহাজেই রয়েছে রমজানের অতিপ্রয়োজনীয় পণ্য যেমন—চাল, ডাল, চিনি, তেল ও খেজুর। বাকিগুলোতে রয়েছে সার ও সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামাল। পণ্য খালাস করতে দেরি হওয়ায় প্রতিটি জাহাজকে দিনে প্রায় ১৬ লাখ টাকা জরিমানা (ডেমারেজ) গুনতে হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে পণ্যের বাজারে।
সংকটে পোশাক শিল্প
রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস পোশাক খাত এই ধর্মঘটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কারখানা মালিকরা বলছেন, সঠিক সময়ে পণ্য জাহাজীকরণ করতে না পারলে বিদেশের বাজারে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে এবং অনেক কার্যাদেশ বাতিল হতে পারে। বিজিএমইএ পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী ও উদ্যোক্তা মোহাম্মদ হোসেন উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, কাঁচামালের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং তৈরি পণ্য বন্দরে পাঠানো যাচ্ছে না। দ্রুত সমাধান না হলে কারখানা বন্ধ করা ছাড়া বিকল্প থাকবে না।
বাজার সিন্ডিকেটের ভয় ও ভোক্তা অধিকার
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, পাইকারি বাজারে এখনো দাম না বাড়লেও সরবরাহ বন্ধ থাকলে রমজানে সংকট তীব্র হবে। ক্যাব (CAB) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন এই পরিস্থিতির দ্রুত অবসানে সরকারের কঠোর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
অন্যদিকে, পণ্য পরিবহন মালিকরা বলছেন, পাঁচ দিন ধরে গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকায় তারা ব্যাংক ঋণ পরিশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ এই অচলাবস্থার জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও বন্দর কর্তৃপক্ষের নিরবতাকে দায়ী করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
